মোবাইলে ট্যাক্স প্রতিবন্ধকতা দূর করার আহ্বান
"স্মার্ট ডিভাইসের জন্য বাংলাদেশের ট্যাক্স পৃথিবীর দ্বিতীয় শীর্ষে।” তাই “এই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে” বলে মত দিয়েছেন জিএসএমএ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মোবাইল ফর ডেভেলপমেন্ট পরিচালক রাহুল সাহা। তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বাংলালিংকের সিসিও তাইমুর রহমান বলেছেন, "২০০৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে টেলিকম অপারেটররা বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু পৃথিবীর সর্বোচ্চ ট্যাক্স পলিসি বাংলাদেশে। আমাদের পলিসিতে নজর দিতে হবে।”
একইভাবে ডেটা সেবার প্রসারে প্রতিবন্ধকতাগুলোকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে রবির চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেছেন, "আমাদের স্বচ্ছতা (ট্রান্সপারেন্সি), যোগাযোগ (কানেক্টিভিটি) ও দুর্নীতি দূর করতে (রিডিইউস দ্য করাপশনের) স্মার্ট বাংলাদেশ প্রয়োজন। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বয়ের জায়গাটা খুব দরকার। বৈশ্বিক তুলনামূলক প্রেক্ষাপটে আমরা অনেক কম খরচে ডেটা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবুও সেটা অনেকের কাছেই সাশ্রয়ী হচ্ছে না মূলত উচ্চ কর হারের কারণে। করের বোঝা একটু কম হলে আরও সাশ্রয়ী মূল্যে গ্রাহকদের ডেটা সেবা দেওয়া সম্ভব।"
টিআরএনবি এবং রবি আজিয়াটা লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে মঙ্গলবার রাজধানীর ব্রাক ইনে অনুষ্ঠিত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তারা।
স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে সরকারের অনন্য পদক্ষেপ এবং টেলিকম অপারেটরদের সহযোগী ভূমিকার কথা উল্লেখ করে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ’র (টিআরএনবি) সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। টিআরএনবি’র নির্বাহী সম্পাদক এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক সমীর কুমার দে'র সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন।
মঞ্জুর হোসেন প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, “২০০৯ সালে ’ডিজিটাল বাংলাদেশ’ আমাদের রাষ্ট্রীয় পলিসিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য এখন আমাদের টেলিকম, আইটি, ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইফিসিয়েন্সি বাড়ানো, সার্ভিস কস্ট কমানো, ডিজিটাল লিটারেসি, ডিভাইস পারচেজিং ক্যাপাসিটি বাড়ানোর জন্য কাজ করতে হবে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে মোবাইল অপারেটরদের বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। এজন্য প্রয়োজনে ইনসেনটিভ দেয়া উচিত।"
নুরুল মাবুদ চেীধুরী, মহাব্যবস্থাপক, আইটি এন্ড বিলিং, ইনোভেশন অফিসার, টেলিটক বলেন, "আমাদের আইসিটি উপদেষ্টা স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য রোবোটিকস, সাইবার সিকিউরিটিসহ চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। সমন্বিত ডাটা ম্যানেজমেন্ট করতে পারলে আমরা স্মার্ট হতে পারবো।"
নগদের চিফ বিজনেস অফিসার শেখ আমিনুর রহমান বলেন, "টেলিকম দিয়েই ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়, এখন সবার কোলাবোরেশান হলে স্মার্ট বাংলাদেশ খুব বেশি দূরে নয়।"
এটুআই চিফ ফরহাদ জাহিদ শেখ, চিফ ই-গভর্ন্যান্স স্ট্র্যাটেজিস্ট, এটুআই বলেন, "ডিজিটাল বাংলাদেশ সফল হওয়ার পরে মাননীয় আইসিটি উপদেষ্টা স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য সিটিজেন, সোসাইটি, ইকোনমি ও গভর্নেন্স এই চারটি পিলারের কথা বলেছেন। স্মার্ট বাংলাদেশ কোয়ানটিটি নির্ভর না হয়ে কোয়ালিটি নির্ভর হবে।"
মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন এমটবের মহাসচিব এস এম ফরহাদ বলেন, "স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে স্মার্ট ডিভাইস যারা ব্যবহার করেন তাদের স্মার্ট লিটারেসির প্রয়োজন আছে।"
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপচার্য অধ্যাপক ড. সত্য প্রসাদ মজুমদার বলেন, "পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যখন ৬জি নিয়ে কাজ করছে তখনও আমরা ৫জিতে যেতে পারিনি। আমাদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ডাটা কমিউনিকেশন ডেভেলপমেন্ট ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে। স্মার্ট বাংলাদেশে গড়তে ইউনিভার্সিটিগুলোর সাথে ইন্ডাস্ট্রির সমন্বয় এবং আইসিটি, তথ্য, টেলিকমসহ মিনিস্ট্রিগুলোকে সকল স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আলোচকরা বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন ২০২১ প্রণয়ন এবং এর সফল বাস্তবায়নের ফলে অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এর ফলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ; আগামী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের মধ্যে তা বাস্তবে রূপ নেবে। ভবিষ্যৎমুখী স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা/নীতি প্রণয়ন জাতির এই অগ্রগতিকে সহজতর করছে।
ভিশন ২০২১ এর আওতায় ডিজিটাল রূপান্তর, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো নেয়া উদ্যোগগুলো ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নের পথে শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। সরকারি ডিজিটাল সেবাপ্রদানকারী প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণ মানুষের জন্য নতুন নতুন সুযোগ উন্মোচন করেছে; পাশাপাশি গড়ে তুলছে ডিজিটাল সেবা গ্রহণে তাদের মানসিকতা। ডিজিটাল কানেক্টিভিটি ইকোসিস্টেমে গঠিত শক্তিশালী অবকাঠামোর উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এবং স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশন- ২০৪১ বাস্তবায়নে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।
টেলিযোগোযোগ সেবার হাত ধরে ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। এর ফলে এখন যে কেউ ডিজিটাল/স্মার্ট অর্থনীতিতে নিজেকে আরও সম্পৃক্ত করার সুযোগ পেয়েছেন। এক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ সিঙ্গাপুরের স্মার্ট ন্যাশন। সেদিকে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় একটি স্মার্ট নেশন ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে শিল্প পর্যায়ে কী অসাধারণ ভুমিকা রাখতে পারে।
চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আগে সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন এবং ওই ক্ষেত্রগুলোতে অগ্রগতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নিশ্চিত করতে চারটি প্রাতিষ্ঠানিক স্তম্ভ এবং সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দূরদর্শী চিন্তাধারার মাধ্যমে স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। সরকার ইতোমধ্যে একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন এবং প্রাথমিক কাজের ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়েছে প্রাসঙ্গিক স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে; যা সঠিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। প্রতিটি খাত অনুযায়ী লক্ষ্য এবং চূড়ান্ত ফলাফল নিশ্চত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবেনা।
স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১-এর চারটি মূল স্তম্ভ রয়েছে; যার প্রথম দু’টি হল স্মার্ট নাগরিক এবং স্মার্ট সরকার- যার মাধ্যমে সকল সেবা এবং মাধ্যম ডিজিটালে রূপান্তরিত হবে। অন্যদিকে স্মার্ট সোসাইটি এবং স্মার্ট ইকোনমি স্মার্ট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই চারটি স্তম্ভের আওতায় ব্যাপক রূপান্তরের পাশাপাশি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগুলো স্মার্ট বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।